
বিশেষ প্রতিবেদন
চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ দ্রুতগতিতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে হস্তান্তর হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা দেশের কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্দরের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের মধ্যে ইতোমধ্যেই পাঁচটিরই ইজারা বিদেশি অপারেটরের হাতে সম্পন্ন হয়েছে, বাকিগুলো নিয়েও চলমান আলোচনা চলছে। এই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ফলে বন্দর ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ মূলত বিদেশিদের হাতে চলে যাচ্ছে, যা জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ১৭ নভেম্বর লালদিয়ার চর কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে ৩০ বছরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই দিনে পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডলগ এসএ-কে ২২ বছরের জন্য। এছাড়া, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বর্তমানে পরিচালনা করছে নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেড, যা বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৪৪ শতাংশ। এনসিটি নিয়েও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে পরিচালনার চুক্তি নিয়ে দর-কষাকষি চলছে।
চট্টগ্রামের মেগাপ্রকল্প বে টার্মিনালের দুটি অংশ পরিচালনা করবে যথাক্রমে ডিপি ওয়ার্ল্ড (আবুধাবি) ও পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল (সিঙ্গাপুর)। অন্যদিকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিটিসি) পরিচালনা করছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আরএসজিটি। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, পিটিসিতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রাপ্ত ট্যারিফ প্রচলিত হার থেকে অত্যন্ত কম—যার ফলে রাজস্ব ক্ষতি হবে।
দেশের বন্দরগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ হিসেবে কাজ করছে। রাজস্ব আয়, পণ্য খালাস, সহনীয় ফি এবং দ্রুত লজিস্টিকস ব্যবস্থা ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ইজারা চুক্তি দেশের প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা, আমদানি খরচ এবং রপ্তানি খরচ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে পোশাক ও হালকা শিল্প খাত ইতিমধ্যেই বৈদেশিক শুল্ক ও ক্রমহ্রাসমান রপ্তানি প্রবণতার কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এতে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিক সংগঠন, বন্দর ব্যবহারকারী এবং রাজনৈতিক দলগুলো এই সিদ্ধান্তকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী ও অস্বচ্ছ বলে অভিহিত করেছে। চট্টগ্রামে মঙ্গলবার এনসিটি ও সিসিটি বিদেশিদের কাছে না দেওয়ার দাবিতে মশাল মিছিল, সড়ক অবরোধ ও প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়েছে। শ্রমিক সংগঠন স্কপ হুঁশিয়ারি দিয়েছে—লালদিয়া ও পানগাঁওয়ের চুক্তি অবিলম্বে বাতিল না হলে হরতাল, অবরোধ ও কঠোর আন্দোলন করা হবে। বাম জোটও সারা দেশে পদযাত্রা, গণসংযোগ এবং প্রয়োজনে হরতাল কর্মসূচি চালানোর ঘোষণা দিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদেশি অপারেটরের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করবে। তবে ব্যবহারকারীরা ও বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি, গোপন চুক্তি এবং ফি ও মাশুল বাড়ানোর অধিকার বিদেশিদের হাতে তুলে দিলে দেশের অর্থনীতি, বন্দর সক্ষমতা এবং জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগ অবশ্যই দরকার, তবে দেশের প্রধান কৌশলগত স্থাপনা ও আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিদেশি অপারেটরের হাতে হস্তান্তর করা উচিত নয়। তারা জাতীয় স্বার্থ, স্টেকহোল্ডারদের মতামত এবং পর্যাপ্ত সময় ছাড়া চুক্তি করার পদ্ধতিকে গণবিরোধী বলে উল্লেখ করেছেন।